
প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর প্রথমবারের মতো নিজস্ব আয়ের বৈদেশিক মুদ্রায় জ্বালানি তেল আমদানির বিল পরিশোধের ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক রুটের বিভিন্ন ফ্লাইট অপারেটরদের কাছে উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত মার্কিন ডলার এতদিন স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে ফেলা হতো। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি এই বৈদেশিক মুদ্রা দিয়েই আমদানির বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি এই সংস্থাটি। এর ফলে প্রথম চালানের বিল পরিশোধেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্থিক সাশ্রয় হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বিপিসি।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল পিএলসি দেশীয় রুটের উড়োজাহাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো থেকেও ডলারে বিল আদায় করে থাকে। কিন্তু পূর্বে নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব বা এফসি অ্যাকাউন্ট না থাকায় এসব ডলার তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করতে হতো। এর ফলে ডলারের ক্রয় ও বিক্রয় হারের ব্যবধানের কারণে প্রতি ডলারে বিপিসির আর্থিক ক্ষতি হতো। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও নানামুখী আলোচনার পর সম্প্রতি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে বিপিসি ও পদ্মা অয়েলের যৌথ উদ্যোগে এফসি অ্যাকাউন্ট খোলার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যায় এবং সেখানে ডলার জমা হতে শুরু করে।
এই নতুন ব্যবস্থার সুফল হিসেবে সম্প্রতি সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিপ্যাক থেকে আমদানিকৃত ডিজেলের একটি চালানের মূল্য সরাসরি এফসি অ্যাকাউন্টের ডলার থেকে পরিশোধ করা হয়। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, কেবল এই প্রথম পার্সেল বা চালানের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেই প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হয়েছে। এর মধ্যে বিনিময় হারের তারতম্য থেকে বাঁচা এবং ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকে অতিরিক্ত অর্থ জমা না রাখার ফলে ব্যাংক সুদ থেকে বাড়তি মুনাফা অর্জনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপে দীর্ঘমেয়াদে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হবে।
জ্বালানি আমদানির জন্য নিয়মিত বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হওয়ায় বিপিসির এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত দেশের চলমান ডলার সংকটের মধ্যেও স্বস্তি বয়ে এনেছে। প্রতি বছর জেট ফুয়েল বিক্রির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বর্তমান বিনিময় হারের হিসাব অনুযায়ী, এই নতুন ব্যবস্থার সুবাদে বার্ষিক প্রায় শত কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়া সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করছে বিপিসি কর্তৃপক্ষ। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদসহ অন্যান্য কর্মকর্তার নিরলস প্রচেষ্টায় এই জটিল প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।