
স্বাস্থ্য ডেস্ক: দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অচলাবস্থার কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আড়াই শ থেকে পাঁচ শ শয্যায় উন্নীত হলেও এই প্রতিষ্ঠানে এখনো পুরোনো জনবল কাঠামো দিয়েই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীরা চরম হিমশিম খাচ্ছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, প্রয়োজনের তুলনায় শয্যা সংখ্যা কম থাকায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। অতিরিক্ত এই রোগীর চাপের কারণে নিয়মিত ওষুধ ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ওপরও প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। নিয়মিত সেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসকসহ মোট ১ হাজার ১২০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে ৯৫৪ জন কর্মরত রয়েছেন এবং প্রায় ১২৬টি পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসকের ২১৮টি পদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৮৮টি পদই ফাঁকা পড়ে আছে। অন্যদিকে বহির্বিভাগেও প্রতিদিন সকাল থেকেই রোগীদের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই টিকিট শেষ হয়ে যায়। চিকিৎসক সংকট এবং দীর্ঘ সারির কারণে শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ; সিঁড়ি ও ফাঁকা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং টয়লেটগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কথা জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা। একই সঙ্গে হাসপাতালের দালাল চক্র সক্রিয় থেকে বিভিন্ন অজুহাতে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হাসপাতালের প্যাথলজি ও জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার বেহাল দশা। রেডিওলজি বিভাগের এমআরআই মেশিনটি গত এক দশক ধরে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। এর পাশাপাশি সিটি স্ক্যানসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষণের যন্ত্রও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে ভর্তি থাকা রোগীদের সিংহভাগ পরীক্ষাই হাসপাতালের বাইরে অবস্থিত চটকদার ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে করাতে হচ্ছে। অনেক সময় জনবল সংকটের অজুহাতে দুপুর গড়ানোর আগেই হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীরা বড় ধরনের বিপাকে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা করান। চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগীর স্বজন জানান, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের একটি বা দুটি সাধারণ পরীক্ষা ছাড়া বাকি প্রায় সব পরীক্ষাই বাইরে থেকে করাতে হয়েছে।
চিকিৎসা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার কথা স্বীকার করে হাসপাতালের পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর কবির জানিয়েছেন, জনবল ঘাটতি পূরণ এবং অচল যন্ত্রপাতি সচল করার বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান যে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন দুটিকে বাতিল ঘোষণা করে নতুন মেশিন আমদানির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। খুব শীঘ্রই এই সংকটগুলো নিরসন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে নতুন করে এক হাজার শয্যার পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামোর তালিকা প্রস্তুত করে খুব দ্রুতই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষের এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসালয়টিতে সেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।