
রাজধানী ঢাকায় বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের এক জরিপে সড়ক ব্যবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরের প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে লেনভিত্তিক বাস চলাচলের উপযোগী পাওয়া গেছে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১২ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। পুরো চার হাজার কিলোমিটার সড়ককে বাসের জন্য বিবেচনা করা হয়নি, কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে অনেক সড়কই বড় বাস চলাচলের মতো প্রশস্ত নয়। যেসব সড়কে পর্যাপ্ত লেন নেই, সেগুলোতে মূলত রিকশা ও অটোরিকশার মতো ছোট যানবাহন চলাচল করবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
<প>গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত বাস রুট রেশনালাইজেশন সংক্রান্ত এক মতবিনিময় সভায় এই জরিপের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, এই জরিপ কার্যক্রমের আওতায় মহানগরের সচল ৯৮টি রুটে দশ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং পঁয়ত্রিশ হাজারের বেশি যাত্রীর উৎস ও গন্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া বাসের নেটওয়ার্ক নিখুঁতভাবে পর্যালোচনার জন্য ৫২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা বাহাত্তর ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয় এবং ড্রোনের মাধ্যমে প্রায় চারশ কিলোমিটার এলাকার প্রকৌশলগত চিত্র ধারণ করা হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিদ্যমান আটানব্বইটি রুট পুনর্বিন্যাস করে বত্রিশটি মূল রুট চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার প্রায় সত্তর শতাংশ বর্তমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
<প>পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা রোধ করতে রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একক কোনো মালিকের সঙ্গে নয়, বরং কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি চুক্তি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি রুটে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর প্রস্তাব রয়েছে এবং নিয়মভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে আগামী দুই মাসের মধ্যে শহরের সব বাস মেরামত ও নির্দিষ্ট রঙে রূপান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ ও জীর্ণ বাস চলাচল বন্ধ করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং মালিক সমিতির সমন্বয়ে বিশেষ টিম গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
<প>তবে এই জরিপের ফলাফল ও কার্যকারিতা নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে নানা মত ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ২৮০ কিলোমিটার সড়ককে বাসোপযোগী বলার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানিয়েছেন যে, হকার, অবৈধ পার্কিং ও বিভিন্ন যানবাহনের দখলের কারণে সড়কের কার্যকর প্রস্থ অনেক কমে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ জানান, তারা কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনায় আগ্রহী এবং এটি বাস্তবায়িত হলে মালিকদের আয় সুরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খাতের অতিরিক্ত ব্যয় কমবে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই নগরে কেবল দখল উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হবে।