
বগুড়ার শেরপুর ও শাজাহানপুর উপজেলায় সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে নানা কৌশলে তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। জনবসতিহীন এলাকার পরিত্যক্ত মুরগির খামার এবং বিভিন্ন গুদামঘর ব্যবহার করে একটি প্রতারক চক্র এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। লোভনীয় অঙ্কের আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টের ছবি এবং ফেস ভেরিফিকেশন বা মুখচ্ছবির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংগৃহীত এসব অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য পরবর্তীতে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি স্থানীয় কিছু স্কুলশিক্ষার্থী আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এই অভিনব তথ্য চুরির সিন্ডিকেটের বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কর্মকাণ্ডের ফলে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্থানীয় বেশ কয়েকজন তরুণ, যারা দীর্ঘ দিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবে এই জাল বিস্তার করেছে। সাব্বির হাসান রাকিব এবং সৈকত ইসলাম নামের দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে এলাকার সহজ-সরল মানুষ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে এই ভেরিফিকেশনের কাজ চালানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে শিশুদের এই কাজে যুক্ত করা হয়েছে এবং তারা আবার অন্য কিশোরদেরও সেখানে ধরে নিয়ে আসত। বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার নামে ক্যামেরার সামনে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় মুখমণ্ডল ঘোরানো এবং চোখের পাতা ফেলার মতো বায়োমেট্রিক তথ্যগুলো রেকর্ড করা হতো। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য সাহায্যপ্রার্থী গরিব মানুষ কিংবা সাধারণ চা-দোকানিদের টার্গেট করেও তাদের পাসপোর্টের তথ্য ও ছবি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন খামার ও গুদামের আশপাশে প্রচুর কিশোরের সন্দেহজনক আনাগোনা লক্ষ্য করা যেত। সম্প্রতি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী স্কুলব্যাগ রেখেই ওই খামারে চলে যাওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পেয়ে অভিযান পরিচালনা করলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি এবং ফেস ভেরিফিকেশনের কাজে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি অভিযুক্ত সাব্বিরের বাসায় পুলিশি অভিযান চালানো হলেও তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। এই ধরনের অবৈধ তথ্য চুরির সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো চক্র বা বড় কোনো অপরাধী নেটওয়ার্ক জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মুখচ্ছবির মতো গোপনীয় তথ্য এভাবে চলে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাইবার অপরাধ বা আর্থিক কেলেঙ্কারির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হয়ে এসব অপরাধী চক্রের মূলোৎপাটন করতে হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।