
স্বাস্থ্য ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনে কুশল বিনিময়ের সময় আমরা প্রায়শই একে অপরকে কেমন আছো বলে খোঁজ নেই, কিন্তু তাতে কি আসলেই কারো মনের প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব হয়? অনেকেই নানা ধরনের মানসিক কষ্টে ভুগেও নিজের কথাগুলো খুলে বলার মতো নির্ভরযোগ্য কোনো সঙ্গী পান না, আবার প্রাতিষ্ঠানিক সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও নানা জটিলতায় তা হয়ে ওঠে না। যাঁরা এই ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া শুরু করেন, তাঁদের একটি বড় অংশ মাঝপথে চিকিৎসা ছেড়ে দেন কিংবা নির্ধারিত কাউন্সেলিং সেশন শেষ করেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বা মানসিক শান্তি পান না। এই পরিস্থিতিতে শুধু রোগীদের নিয়ে আলোচনা না করে তাঁদের মনের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় তাঁদের সরাসরি যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক আহ্বানও ঠিক একই রকম, যেখানে বলা হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন মানুষের মতামতকে নীতি নির্ধারণ ও সেবার পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে। মূলত রোগীদের জন্য আলাদা কোনো পরিকল্পনা না করে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই নীতিনির্ধারণী পরিবর্তন আনতে হবে। বিশ্ব সংস্থাটির নির্ধারিত প্রতিপাদ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের বাস্তব কণ্ঠস্বর ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করলেই কেবল সমাজে সত্যিকারের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের একটি অত্যন্ত সামান্য অংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়, যার বড় একটি অংশ ব্যয় হয় কেবল প্রথাগত হাসপাতালগুলোতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির মানসিক কষ্ট সবসময় কেবল তাঁর নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে তৈরি হয় না, বরং এর পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং পারিপার্শ্বিক চাপও বড় ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানের এক নারীর উদাহরণ টেনে বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বাধা এবং স্বাধীনতার অভাব কীভাবে নারী ও তরুণ প্রজন্মের মনে গভীর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, তা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না। অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো দুঃসহ ঘটনা বা কষ্টকর শৈশবকে মুছে ফেলা সম্ভব না হলেও সঠিক মানসিক সহায়তার মাধ্যমে একজন মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রসহ সব জায়গায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এবং শিশু-কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনো ধরনের মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পুরোনো জরিপ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়, মানসিক সমস্যায় ভোগা বড় একটি অংশ মানুষই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে যায়। বিশ্বজুড়েও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করার হার এখনো বেশ কম। তবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক উদ্যোগের মতো সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।