
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক বায়ুমানের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের বায়ুমান পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি প্রায় নিয়মিতভাবেই নিরাপদ সীমা অতিক্রম করছে। প্রথাগতভাবে শুধু রাজধানীকে বায়ুদূষণের মূল কেন্দ্র মনে করা হলেও বর্তমান তথ্য প্রমাণ করছে যে এই সংকট এখন গোটা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। মহানগর থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, শিল্পাঞ্চল এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়েও বায়ুর মান দ্রুত অবনতি হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের মূল উপাদান হিসেবে পরিচিত অতি সূক্ষ্ম কণা পিএম ২.৫ এবং কিছুটা বড় কণা পিএম ১০-এর উপস্থিতি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বহু গুণ বেশি রয়েছে। বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার হিসাবে পিএম ২.৫-এর নিরাপদ মাত্রা ৬৫ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম ১০-এর মাত্রা ১৫০ মাইক্রোগ্রাম হওয়ার কথা। অথচ গত ছয় মাসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পিএম ২.৫-এর গড় মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চার থেকে ছয় গুণ এবং পিএম ১০-এর মাত্রা দ্বিগুণের বেশি ছিল। পর্যবেক্ষণকৃত ১৬টি স্টেশনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক দিনই দেশের বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ জাতীয় মানমাত্রার ওপরে অবস্থান করেছে।
বছরের বিভিন্ন মাসে দূষণের মাত্রা ওঠানামা করলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনো বড় ধরনের উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি। বিশেষ করে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে দূষণের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, যেখানে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহের মতো জনবহুল এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক অঞ্চলে টানা এক মাস ধরে প্রতিদিন বাতাসের মান নিরাপদ সীমার নিচে নামেনি, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। নারায়ণগঞ্জে পিএম ২.৫-এর মাত্রা জাতীয় মানের প্রায় ছয় গুণ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে, যা মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, অবৈধ ইটভাটা ও ব্যাটারি গলানোর কারখানা বন্ধ করা এবং জরিমানা আদায়ের মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল এখনো দৃশ্যমান নয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে বাতাসে উপস্থিত এই বিষাক্ত কণাগুলো বিশেষ করে পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০ ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে হাঁপানি, সিওপিডি এবং ফুসফুসের নানা জটিল রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া বাতাসে থাকা সিসার মতো বিষাক্ত উপাদান শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।