
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একুশতম অধিবেশনে ভাষণ প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে এই আন্তর্জাতিক মহামঞ্চে তার ভাষণ শুরু হয়। ভাষণের শুরুতে তিনি সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় খলিলুর রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান এবং একই সঙ্গে বিদায়ী সভাপতি এনালেনা বেয়ারবককে তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ানোর এই মুহূর্তে নিজের পরিবারের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁর পিতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অতীতে এই একই মঞ্চে দেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইতিহাসের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বিশেষভাবে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানান। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের আন্দোলন ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের কথা তুলে ধরে তিনি জানান যে, দেশের জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। তিনি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন যে, জনগণই যেকোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বজুড়ে চলা সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে অনেক দেশ আজ অশান্ত হয়ে পড়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপ সহ্য করছে, যার প্রভাবে জ্বালানি সংকট এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। যেকোনো ধরনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধানে সামরিক শক্তির পরিবর্তে আলোচনা, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পারস্পরিক সমতা, ন্যায্যতা এবং মর্যাদা রক্ষাকে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সামরিক খাতের ব্যয় বৃদ্ধি এবং অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধের জোরালো দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, উন্নয়নের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়। বাংলাদেশ একটি শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের লক্ষ্যের প্রতি অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর চলা নিপীড়নের কথা উল্লেখ করে তিনি ফিলিস্তিনের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। পরিশেষে, মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, কূটনীতি ও মানবতাকে বিশ্ব পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজ গঠনের আহ্বান জানান তিনি।