
মোঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রতাপশালী শাসক সম্রাট জাহাঙ্গীর তার রাজকীয় জীবন ও ক্ষমতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন উন্মুক্ত স্বীকারোক্তির জন্যও ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছেন। বিশেষ করে, প্রকাশ্য দরবারে নিজের মদ্যপানের তীব্র আসক্তি এবং তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তাকে যে দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা তিনি নিজেই খোলামেলাভাবে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। ঐতিহাসিক বিভিন্ন দলিল ও তার আত্মজীবনীতে এই আসক্তির পেছনের না বলা অনেক গল্প স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যা তৎকালীন রাজপরিবারের অন্দরমহলের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, সম্রাটের এই সর্বনাশা নেশার সূচনা হয়েছিল খুবই আকস্মিকভাবে এবং অত্যন্ত কম বয়সে। রাজকীয় চাপ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং মানসিক অবসাদ দূর করার উদ্দেশ্যে প্রথমদিকে তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শে ওষুধ হিসেবে সামান্য পরিমাণে মদ পান করা শুরু করেছিলেন। তবে সময়ের আবর্তে সেই চিকিৎসাগত ব্যবহারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং একসময় তা তীব্র নেশায় রূপ নেয়, যা তার ব্যক্তিগত ও রাজকীয় জীবনকে মারাত্মকভাবে গ্রাস করতে শুরু করে।
একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হতে থাকে। তার এই মারাত্মক দুর্বলতা রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল, যা তার নিকটজনদেরও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। চিকিৎসকদের শত সতর্কবাণী এবং বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘকাল এই সর্বগ্রাসী নেশার কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছিলেন।
অবশেষে দীর্ঘ আত্মোপলব্ধি এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি এই মরণনেশা থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি অত্যন্ত সৎভাবে এই নেশা ছেড়ে দেওয়ার অবিশ্বাস্য সংগ্রামের কষ্টকর দিনগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে গেছেন, যা পাঠকদের কাছে আজও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। পরিশেষে তিনি চিকিৎসকদের সহায়তা ও নিজের কঠোর মনোবলে ধীরে ধীরে মদ্যপান একেবারে কমিয়ে আনেন এবং একটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।