
বাগেরহাটের মোংলা থেকে কোস্টগার্ডের পরিচয়ে মিরাজ শেখ নামক এক যুবককে তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর কোনো সন্ধান মিলছে না। চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে নিখোঁজ থাকা এই যুবকের পরিবার বারবার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো হদিশ পায়নি। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ব্লাস্ট এই ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে গুমের প্রথম ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বীদের গোপনে তুলে নিয়ে যাওয়ার যে বেআইনি সংস্কৃতি চালু ছিল, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই পুরনো আতঙ্ক আবার ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিখোঁজ মিরাজের স্ত্রী মুক্তার বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় কোস্টগার্ডের পোশাকধারী ও সাদাপোশাকে কিছু লোক তাকে একটি ঘরে আটকে রাখার পর স্পিডবোটে করে হাড়িবাড়িয়া ক্যাম্পের দিকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিবারের পক্ষ থেকে ফাঁড়িতে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে আটকের কথা স্বীকার করা হলেও পরের দিন দায়িত্বপ্রাপ্তরা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এমনকি এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় এবং মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি পালন করায় মিরাজের স্ত্রী, মা ও বোনকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাবাস করানো হয় এবং তাদের পরিবারের ওপর চরম মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মিরাজ শেখকে আটক বা হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। তাদের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে এই ঘটনার সাথে বাহিনীর সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে দাবি করা হয়েছে। তবে হাইকোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মিরাজকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ পায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কার না হলে এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন না করা হলে এ ধরনের মানবতাবিরোধী চর্চা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হলেও একজন নাগরিক এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। মিরাজ শেখকে জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং এর সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার কর্মী। গুমের মতো সংস্কৃতি চিরতরে নির্মূল করতে হলে কেবল আনুষ্ঠানিক অস্বীকার নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।