
অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী মন্থর গতির কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের হার। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পোৎপাদন। এর ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক এই স্থবিরতার নেতিবাচক প্রভাবে গত অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হয়েছে।
রাজধানীর বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমেসহ অন্যান্য শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার হিসাবে গত অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জাতীয় পর্যায়েও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী অর্থবছরগুলোতেও এই প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
বিনিয়োগের বেহাল দশা এবং শিল্প খাতে স্থবিরতার কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বেসরকারি ও সরকারি উভয় খাতেই বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার নিচে কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে কোথাও কোথাও কর্মী ছাঁটাই বা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি, মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপের কারণে স্বল্প আয়ের ও দিনমজুর মানুষের প্রকৃত মজুরি ক্রমেই কমে যাচ্ছে এবং তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে গেছে। অন্যদিকে, রাজস্ব আদায়ের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় এবং সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও প্রবাসী আয়ে কিছুটা স্বস্তি বজায় রয়েছে, তবে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ এবং জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দ্রুত ও সাহসী সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে, বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে, কারণ বর্তমানে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই এই সহায়তার বাইরে রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো কার্যকর উদ্যোগ এবং সঠিক ডেটাবেস ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে বলে মনে করে সংস্থাটি।