
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার মদনপুর গ্রামের কলেজশিক্ষক সফিয়ার রহমান সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে দীর্ঘকাল ধরে প্রকৃতির সুরক্ষায় ব্যতিক্রমী এক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো ধরনের সরকারি অনুদান বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই তিনি গ্রামীণ রাস্তার দুই পাশ, রেললাইনের ধার কিংবা নদীতীরে নিয়মিত বীজ ও চারা রোপণ করে চলেছেন। স্থানীয় এলাকায় তিনি গাছপাগল শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন এবং তাঁর এই নিঃস্বার্থ কর্মকাণ্ড এলাকার পরিবেশের চিত্র বদলে দিয়েছে। চলতি বছর চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করতে তাঁর এই বৃক্ষরোপণ অভিযান এখনও থেমে নেই।
এই সবুজ বিপ্লবের যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, যখন তিনি একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় সরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথম চারা রোপণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজে যোগদানের পর তাঁর এই কার্যক্রম আরও প্রসারিত হয় এবং নতুন মাত্রা লাভ করে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে স্থানীয় এক কৃষকের অনুপ্রেরণায় তিনি ব্যাপকভাবে তাল ও খেজুরের বীজ রোপণ শুরু করেন। একজন সাধারণ কৃষকের দেশপ্রেম ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ বৃক্ষপ্রেমীতে পরিণত করে।
গত এক দশকে সফিয়ার রহমানের হাতে রোপণ করা গাছের সংখ্যা বিস্ময় জাগানোর মতো, যার মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার তাল, খেজুর, আম, জাম এবং দেবদারু গাছ। ঝিকরগাছা-রাজগঞ্জ সড়ক কিংবা মনিরামপুরের বিভিন্ন রাস্তার পাশে তাঁর ছড়ানো বীজ থেকে গজিয়ে ওঠা গাছগুলো আজ বড় হয়ে পথচারীদের ছায়া দিচ্ছে এবং এলাকার সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু সড়ক নয়, তিনি নিজের কর্মস্থল মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চত্বরেও নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন নিশ্চিত করেছেন। তাঁর এই কাজে মাঝে মাঝে স্থানীয় শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিবেশ রক্ষা, মাটির ক্ষয় রোধ, বজ্রপাত থেকে মানুষের জীবন বাঁচানো এবং সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনই তাঁর এই দীর্ঘ সাধনার মূল উদ্দেশ্য বলে জানান এই শিক্ষক। মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সফিকুল ইসলাম জানান, সফিয়ার রহমান শুধু ক্লাসেই নন, পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতেও শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন। শিক্ষকমণ্ডলী ও স্থানীয় সুধীমহল মনে করেন, সফিয়ার রহমানের মতো প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রকৃতির সুরক্ষায় এগিয়ে আসেন, তবে আমাদের চারপাশের পরিবেশ আরও অনেক বেশি সুন্দর ও নিরাপদ হয়ে উঠবে।