
নেত্রকোনার হাওরবেষ্টিত খালিয়াজুরী উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে বিচারক হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন শুভ আহম্মেদ। সম্প্রতি প্রকাশিত ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বা বিজেএস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। ধনু নদের তীরে অবস্থিত জগন্নাথপুর গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। হাওর অঞ্চলের কারণে বছরের প্রায় ছয় মাস এলাকাটি পানিতে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো থাকত, যেখানে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা বা ট্রলার। এই কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করেই নিজের শৈশব ও কৈশোর পার করতে হয়েছে তাঁকে।
কৈশোর থেকেই মেধাবী ও দূরদর্শী ছিলেন শুভ, যিনি গ্রামের জগন্নাথপুর ময়েজ উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম জিপিএ-৫ পাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এরপর ময়মনসিংহের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজ থেকেও কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট অর্থাৎ তৎকালীন 'বি' ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় নবম স্থান অধিকার করে চমক সৃষ্টি করেন এই তরুণ। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর বড় ভাইদের অনুপ্রেরণা এবং নিজের দূরদর্শী চিন্তাভাবনা থেকে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। তাঁর মা-বাবার উৎসাহ এবং নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি তাঁকে এই কঠিন পথের অভিযাত্রী করে তোলে।
পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বে কোনো শর্টকাট বা সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি অনুসরণ না করে প্রতিটি বিষয় গভীরভাবে অধ্যয়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন শুভ। বিসিএস এবং বিজেএস পরীক্ষাকে লক্ষ্য রেখে তিনি ৩০ দিনভিত্তিক সুনির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করতেন এবং প্রতিদিন টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। মনোযোগ ধরে রাখতে পড়ার সময় স্মার্টফোন রুমের ভেতর তালাবদ্ধ করে রাখতেন এবং ল্যাপটপের ব্যবহারও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিলেন। ফেসুবক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি দূর করতে তিনি স্মার্টফোনের বদলে সাধারণ বাটন ফোন ব্যবহার করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই সুপরিকল্পিত ও কঠোর পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত তাঁকে কাঙ্ক্ষিত সফলতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়।
ফলাফল প্রকাশের পর নিজের রোল নম্বর খুঁজে পাওয়ার সেই মুহূর্তটিকে জীবনের সেরা প্রাপ্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন এই তরুণ বিচারক। এই দীর্ঘ ও বন্ধুর যাত্রায় তাঁর পরিবার ও মামার অকুণ্ঠ সমর্থন ও সাহস জোগানোর কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তিনি। বিচার বিভাগে যোগদানের পর পেশাগত অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির জন্য ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তাঁর। দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের অংশ হিসেবে আগামী দিনে জেলা জজ এবং অদূরভবিষ্যতে দেশের উচ্চ আদালতে বিচারপতির আসনে নিজেকে দেখতে চান এই হাওরকন্যা। নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ হলো, শর্টকাটের পেছনে না ছুটে নিয়মিত রুটিন মেনে অধ্যয়ন করা এবং প্রযুক্তির সঠিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।