
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার খন্দকপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক মো. রফিক মিয়া উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন তার জন্য অত্যন্ত জরুরি হওয়ায় তিনি স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা এনসিডি কর্নারে নিয়মিত ফলোআপে আসেন। আগে এই অঞ্চলে উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষার নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও বর্তমানে তিনি সেখানে নিয়মিত রক্তচাপ মাপতে পারছেন। তবে উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা। চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়, যা বন্ধ হলে বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের কারণে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে রয়েছে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকজনিত সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রোগীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়া হয়, যার ফলে বড় কোনো রোগের মারাত্মক পরিণতি ঘটার আগেই ঝুঁকি কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ময়মনসিংহের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই সেবায় যুক্ত হওয়া রোগীদের জন্য নিয়মিত ওষুধ পাওয়া এখন বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
স্থানীয় চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাদ্দকৃত পূর্বের ওষুধগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। বর্তমানে নতুন কোনো অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের নিজস্ব মেডিকেল সাপ্লাই ও সার্ভিস বা এমএসআর তহবিল ব্যবহার করে ওষুধ ক্রয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই একই তহবিল থেকে হাসপাতালের ইনডোরসহ অন্যান্য অনেক জরুরি সামগ্রীও কিনতে হয়। ফলে এনসিডি প্রোটোকলের নিয়মানুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ কেনা চিকিৎসকদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ওষুধের জোগান ঠিক রাখা না গেলে এই জনকল্যাণমূলক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে প্রায় ৩৪ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী নিবন্ধিত হয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন। প্রান্তিক পর্যায়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চালু করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা মনে করেন, শুধু রোগী শনাক্ত বা নিবন্ধন করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের জন্য নিয়মিত ওষুধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা আবশ্যক। অন্যথায় এই মহৎ উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হতে পারে এবং তাদের শারীরিক ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।