
বিমানের টিকিট কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রির লোভ দেখিয়ে এক অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্র। ভুক্তভোগী ওই প্রকৌশলী এন সায়েম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে প্রথমে যোগাযোগ করে চক্রটি। বিভিন্ন সময়ে আকর্ষণীয় লভ্যাংশ ও ব্যবসার নানা ফাঁদ পেতে তাঁর কাছ থেকে দফায় দফায় মোট ৩৪ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় বিনিয়োগের বিপরীতে কিছু মুনাফা দেখানোর কারণে তিনি চক্রের পাতা ফাঁদে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে নিজের বিনিয়োগ করা পুরো অর্থ তুলতে গেলে প্রতারকরা নানা অজুহাতে আরও টাকা দাবি করতে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিয়ারেন্স ও নিরাপত্তা জামানতের কথা বলে চক্রটি তাঁর কাছ থেকে সর্বস্বান্ত করার মতো অর্থ হাতিয়ে নেয়।
ঘটনাটি বুঝতে পেরে ভুক্তভোগী ব্যক্তি প্রথমে আদালতে মামলা করেন এবং পরবর্তীতে পুলিশের দারুসসালাম থানায় সাধারণ ডায়েরি ও নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলাটি গ্রহণের পর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই। দেশ ও দেশের বাইরের আন্তর্জাতিক সংযোগ থাকায় মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকাসহ খুলনার বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূল হোতাসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পিবিআই। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন মো. মেহেদী হাসান ওরফে সোহাগ, সুমাইয়া খাতুন ওরফে শান্তা এবং আবুল হাসান ওরফে নাঈম।
অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামিদের কাছ থেকে প্রচুর ডিজিটাল প্রমাণপত্র, ব্যাংকের এটিএম ও ডেবিট কার্ড, লেনদেনের রসিদ এবং পাসপোর্টের কপি উদ্ধার করে। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতারণার মূল শিকড় রয়েছে দেশের বাইরে কম্বোডিয়ায়। কম্বোডিয়াভিত্তিক একটি সংঘবদ্ধ চক্র বাংলাদেশি কিছু সহযোগীকে ব্যবহার করে এ ধরনের অনলাইন প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও সুন্দরীদের ছবি ব্যবহার করে প্রথমে টার্গেট করা ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা হতো। পরে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মাধ্যমে তাদের নানামুখী লোভনীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে ফাঁদে ফেলা হতো।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া সমস্ত অর্থ দ্রুত বিভিন্ন ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হতো। এরপর অবৈধ হুন্ডি মাধ্যমে সেই অর্থ চলে যেত কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত মূল হোতাদের হাতে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষকে অনলাইনে অপরিচিত কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরিচয় ও সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে কোনো ধরনের অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগ না করার জন্য জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। অপরাধী যত শক্তিশালী বা চক্র যতই আন্তর্জাতিক হোক না কেন, তাদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে পিবিআই বদ্ধপরিকর বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।