
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগদান শেষে পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর সফলভাবে শেষ করে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁকে বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এর আগে স্থানীয় সময় ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাই হয়ে ঢাকার পথ ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই ছিল তাঁর প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ, যা কূটনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সফরে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সফরের মূল আকর্ষণ ছিল গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান। ভাষণে তিনি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে যুদ্ধ বা অস্ত্রের পরিবর্তে কূটনীতি, পারস্পরিক সংলাপ এবং সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান বিশ্বনেতাদের প্রতি। এছাড়া জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে সরকারের 'থ্রি-আর' কৌশল বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।
নিউইয়র্ক অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত বহু রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। এর মধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকে পারস্পরিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে দেশের স্বাস্থ্যখাত এবং টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ববইটেকেও জোরালো ভূমিকা পালন করেন সরকারপ্রধান। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য অর্থায়ন এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের আহ্বান জানান তিনি। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে এই সফরে বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে উড়োজাহাজ ক্রয়ের বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশের বিমান পরিবহন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রধান ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে শেষ দিনে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সার্বিকভাবে এই কূটনৈতিক সফর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বৈশ্বিক অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে।