
পুণ্যভূমি মদিনার অলিগলিতে জড়িয়ে রয়েছে ইসলামের আদি যুগের নানা সোনালী ঐতিহ্য এবং শিহরণ জাগানিয়া ইতিহাস। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ, সাহাবিদের অকাতর আত্মত্যাগ এবং নবুওয়াতের প্রদীপ্ত অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক মসজিদ। এর মধ্যে মসজিদে গামামাহ, মসজিদে আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.), মসজিদে উমর বিন খাত্তাব (রা.), মসজিদে উসমান জুন-নুরাইন (রা.) এবং মসজিদে আলী বিন আবু তালিব (রা.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি স্থাপনার বুননে মিশে আছে পৃথক ইতিহাস, সুগভীর আবেগ এবং অনন্য ইমানি চেতনা। অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এসব প্রাচীন নিদর্শন দর্শনার্থীদের চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে সাহাবিদের নিঃশর্ত নবীপ্রেমের অমর গাঁথা।
মসজিদে নববির দক্ষিণ-পশ্চিমে মাত্র তিনশ মিটার দূরত্বে অবস্থিত মসজিদে গামামাহ মদিনার জমিনে এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির নাম। একসময় মদিনায় তীব্র অনাবৃষ্টি দেখা দিলে আল্লাহর রাসুল (সা.) এই খোলা প্রাঙ্গণে এসে সালাতুল ইস্তিসকা বা বৃষ্টির জন্য বিশেষ নামাজ আদায় করেছিলেন। তাঁর দোয়ার পরপরই আকাশজুড়ে মেঘের আগমন ঘটে এবং মুষলধারে রহমতের বৃষ্টি শুরু হয়, যার আরবি অর্থ থেকেই মসজিদটির নামকরণ করা হয় গামামাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলোতে এখানেই নিয়মিত ঈদের নামাজ আদায় করতেন বলে একে অনেকে ঈদের মসজিদ নামেও অভিহিত করেন। পরবর্তীতে উমর বিন আবদুল আজিজ মদিনার গভর্নর থাকাকালীন এই পবিত্র স্থানে প্রথম স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেন।
আল-মানাখা এলাকায় মসজিদে গামামাহর পাশেই অবস্থিত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর স্মৃতির সঙ্গে বিজড়িত ঐতিহাসিক মসজিদটি। খেলাফতকালে হজরত ওমর (রা.) এই খোলা প্রাঙ্গণে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন এবং তাঁর সেই স্মৃতিকে অমর করে রাখতে পরবর্তীতে এখানে মসজিদ গড়ে তোলা হয়। বর্তমানের দৃষ্টিনন্দন ভবনটি মূলত উসমানীয় আমলে পুনর্নির্মিত, যা চমৎকার গম্বুজ ও মিনারের মাধ্যমে প্রাচীন আবহের বার্তা দেয়। আধুনিক নগরায়ণের প্রভাবে পুরো মদিনার রূপ বদলে গেলেও উসমানীয় আমলের এই ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এমনকি সৌদি বাদশাহ সালমানের শাসনামলেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির নান্দনিক সংস্কার করা হয়েছে।
একই এলাকার আশপাশে অবস্থিত ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত অপর এক প্রাচীন মসজিদ। নবীজির ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর (রা.) রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর হুবহু অনুসরণ করে ঠিক সেই মাঠের অদূরে ঈদের নামাজ আদায় করতেন, যেখানে নবীজি নিজেই অতীতে ঈদের ও বৃষ্টির নামাজ পড়াতেন। খলিফার সেই নিখাদ আনুগত্যের স্মৃতি ধারণ করে উমাইয়া আমলে উমর বিন আবদুল আজিজের শাসনামলে এখানে প্রথম মসজিদ নির্মিত হয়। উসমানীয় স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি কালো ব্যাসল্ট পাথর, সুদৃশ্য গম্বুজ ও মিনার খচিত এই মসজিদ আজও মদিনার ইতিহাসের এক অপূর্ব স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মদিনার বনী খিদরাহ এলাকায় মসজিদে নববি থেকে সামান্য দূরে রয়েছে ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান বিন আফফান (রা.)-এর নামে নির্মিত ঐতিহাসিক মসজিদটি। ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাস এবং খলিফার অসামান্য ত্যাগের সঙ্গে এই স্থাপনার আত্মিক যোগসূত্র রয়েছে। এটি প্রাচীন মদিনার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতির অন্যতম সুন্দর একটি নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। অন্যদিকে, আল-মানাখা এলাকার আস-সালাম রোডে অবস্থিত চতুর্থ খলিফা হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-এর স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত অপর মসজিদটি। নবীজির ওফাতের পর হজরত আলী (রা.) তাঁর খেলাফতকালে এই মাঠে ঈদের নামাজের ইমামতি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে উমাইয়া যুগে মসজিদে রূপান্তর করা হয় এবং বর্তমানেও সরকারি তত্ত্বাবধানে এটি সংরক্ষিত রয়েছে।