
যুক্তরাজ্য থেকে নিজেদের বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে একসঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সম্প্রতি ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন এই তিন দেশের ফার্স্ট মিনিস্টাররা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ তারকা সেন্ট ডেভিড’স হোটেলে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক বৈঠকে তারা একটি যৌথ ঘোষণায় সই করার পরিকল্পনা করেছেন। এই ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য হলো তিন দেশের ভবিষ্যৎ নিজেদের নির্ধারণ করার অধিকার নিশ্চিত করা এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে পৃথক গণভোট আয়োজনের জোরালো দাবি উত্থাপন করা। কার্ডিফ বে-এর তীরে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের বিরোধী দল ও সিন ফেইনের শীর্ষ নেতৃত্বও অংশ নেন।
বর্তমান রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক সরকারগুলোর নেতৃত্বে স্বাধীনতাপন্থি দলগুলো অবস্থান করছে। স্কটল্যান্ডে এসএনপির জন সুইনি এবং ওয়েলসে প্লেইড কামরুর রুন আপ আইওয়ার্থ নিজ নিজ সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডেও সিন ফেইনের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। স্কটিশ ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে বর্তমান ব্রিটিশ সাংবিধানিক কাঠামো আর টেকসই অবস্থায় নেই। ওয়েস্টমিনস্টার প্রশাসনকে এখন থেকেই যুক্তরাজ্য-পরবর্তী ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে এই স্বাধীনতাপন্থি উদ্যোগ ও গণভোটের ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এর আগে এক চিঠিতে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার বিষয়ে নতুন করে কোনো গণভোট আয়োজনের প্রশ্নই ওঠে না। তার মতে, এ ধরনের স্বাধীনতাকামী বিতর্ক দেশের মূল অর্থনীতি সচল রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে সরকারের মনোযোগ ভিন্ন খাতে সরিয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে কোনো স্পষ্ট ও সর্বসম্মত ঐকমত্য তৈরি হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি। অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রেও যুক্তরাজ্য ত্যাগের পক্ষে জনগণের জোরালো কোনো আগ্রহ নেই বলে মত দিয়েছে লন্ডন।
বৈঠকে মূলত অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ—এই চারটি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং একটি সমঝোতা স্মারক সই করার কথা রয়েছে। তিন দেশই মনে করে যে তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকা উচিত। এছাড়া নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে আইরিশ পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক মন্তব্যের পর নতুন মাত্রা পেয়েছে। এদিকে ওয়েলসের প্লেইড কামরু দল সরকারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা আরও বাড়ানোর দাবি তুলেছে। ক্রাউন এস্টেট থেকে পাওয়া রাজস্বের হিস্যা এবং পুলিশ ও রেল খাতের মতো অতিরিক্ত দায়িত্ব নিজেদের হাতে পাওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। সব মিলিয়ে এই যৌথ উদ্যোগ যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ অখণ্ডতার সামনে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।